
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় চলমান সংকট দীর্ঘকাল ধরে চলা ‘লক্কড়ঝক্কড়’ বাসের প্রভাব ও যাত্রীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ যেন এক অবসানহীন কাহিনীতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকার বাসগুলোর ফিটনেস এবং আসন বিন্যাস নিয়ে উঠা নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে, এক ভুক্তভোগী যাত্রীর অভিজ্ঞতা থেকে একটি করুণ চিত্র প্রকাশ পেয়েছে—যেখানে ছয় ফুট উচ্চতার একজন মানুষের জন্য বাসে সম্মানের সাথে বসার মতো ন্যূনতম জায়গাটুকুও অনুপস্থিত।
বাসের আসন সংখ্যা ও যাত্রীদের দুর্ভোগ সাধারণত একটি বাসে ৪১টি সিট থাকার কথা থাকলেও অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মালিকপক্ষ সেখানে বসিয়ে দিচ্ছে ৪৬টি সিট। এই অতিরিক্ত ৫টি সিটের জন্য যাত্রীদের পায়ের জায়গার ওপর চাপ পড়ছে। ফলে, লম্বা মানুষের তো বটেই, গড় উচ্চতার যাত্রীদেরও হাঁটু সিটের বাইরে বা ৪৫ ডিগ্রি কোণে রেখে ‘আপসের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করতে হচ্ছে। বাসে চলাচলকারী সাধারণ যাত্রীদের মতে, এটি কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং একটি গাণিতিক অনিবার্যতা।
বাসের বয়স ও ভাড়ার অসঙ্গতি বিআরটিএ-র পরিসংখ্যান এবং বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় ৩০ শতাংশ বাসের বয়স ২০ বছরেরও বেশি। এসব বাসের অধিকাংশের নেই বৈধ ফিটনেস বা রুট পারমিট। অবাক করার বিষয় হলো, বিআরটিএ যখন ভাড়া নির্ধারণ করে, তখন তারা নতুন বাসের ক্রয়মূল্য ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচকে বিবেচনায় নেয়। কিন্তু বাস্তবে যাত্রীরা ২০ বছরের পুরোনো মুড়ির টিন সদৃশ বাসে চড়ছেন এবং নতুনের ভাড়া পরিশোধ করছেন। সাধারণ মানুষ একে স্রেফ ‘ঠগবাজি’ হিসেবে দেখছেন।
নিয়মিত অভিযানের অদৃশ্যতা রাজধানীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বিআরটিএ-র অভিযান কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালতের উপস্থিতি মাঝে মাঝে দেখা গেলেও তার স্থায়িত্ব সাধারণত এক সপ্তাহের বেশি হয় না। রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে, নীতিনির্ধারকরা বদলান, এমনকি স্টিয়ারিং ধরার হাতও পরিবর্তন হয়—কিন্তু রাজধানীর লক্কড়ঝক্কড় বাসের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না।

দাঁড়িয়ে থাকার অসুবিধা প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী বাসে উঠলে মাথা নিচু করে চলতে বাধ্য হন, কারণ দাঁড়িয়ে থাকার জন্য পর্যাপ্ত উচ্চতা নেই। সিটে বসলে হাঁটুর জায়গা থাকে না, এবং যদি হাঁটু বাইরে থাকে, তখন সহযাত্রীদের কাছে কটু কথা শুনতে হয়। কারওয়ান বাজার বা ফার্মগেটের মতো ব্যস্ত মোড়ে বাস যখন কানায় কানায় ভরে যায়, তখন এই সংকীর্ণ জায়গায় চলাচল করা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে।
গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য বারবার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। যাত্রীদের দাবি—শুধু সরকার বদল নয়, বরং মানসিকতা ও তদারকি ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন না হলে ঢাকার রাস্তায় ‘হাঁটু বাঁচিয়ে’ চলা কঠিন হয়ে উঠবে।
মন্তব্য করুন
সকল মন্তব্য (0)
এখনও কোনো মন্তব্য আসেনি। প্রথম মন্তব্যটি করুন।